বহুদিন ধরেই নারীদের মধ্যে পরিচিত একটি হরমোনজনিত সমস্যার নাম পিসিওএস (PCOS) বা পলিসিস্টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম। তবে রোগটির প্রকৃত চরিত্রকে পুরোপুরি তুলে ধরতে এর নতুন একটি নাম প্রস্তাব করেছেন আন্তর্জাতিক স্তরের বিশেষজ্ঞরা। নতুন এই নামটি হলো ‘পিএমওএস’ (PMOS) বা পলিএন্ডোক্রাইন মেটাবলিক ওভারিয়ান সিনড্রোম।

চিকিৎসকদের মতে, এটি কেবল নাম বদলের বিষয় নয়, বরং নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের ভুল ধারণা ভাঙার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নারী এই সমস্যায় আক্রান্ত হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একে শুধুমাত্র ডিম্বাশয়ের সিস্টের সমস্যা হিসেবে ভেবে ভুল করা হয়।
কেন এই নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব?
‘পলিসিস্টিক ওভারি’ শব্দটি শুনলেই অনেক নারী আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। অনেকের মনে ভুল ধারণা তৈরি হয় যে, তাদের ডিম্বাশয়ে গুরুতর কোনো সিস্ট তৈরি হয়েছে এবং হয়তো অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পিসিওএস আক্রান্ত বহু নারীর শরীরে কোনো সিস্টই থাকে না।
এই সমস্যার মূল শিকড় লুকিয়ে থাকে মূলত—
-
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং
-
শরীরের বিপাকক্রিয়ার (Metabolism) সমস্যা।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন নাম ‘পিএমওএস’-এর প্রতিটি অংশের অর্থ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ:
-
পলিএন্ডোক্রাইন (Polyendocrine): শরীরের একাধিক হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী গ্রন্থি এর সঙ্গে জড়িত।
-
মেটাবলিক (Metabolic): শরীরের বিপাকক্রিয়া ও ইনসুলিন সংক্রান্ত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
-
ওভারিয়ান (Ovarian): ডিম্বাশয় ও প্রজনন স্বাস্থ্যের গুরুত্ব বোঝাতে এটি রাখা হয়েছে।
যে লক্ষণগুলোকে অনেকেই অবহেলা করেন
এই সমস্যার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সচেতনতার অভাব। বহু নারী বছরের পর বছর নানা উপসর্গ সহ্য করলেও বুঝতে পারেন না যে এগুলো একই সমস্যার অংশ। সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
অনিয়মিত মাসিক
-
হঠাৎ ওজন বেড়ে যাওয়া বা ওজন কমতে না চাওয়া
-
মুখে ব্রণ ও অতিরিক্ত তৈলাক্ত ত্বক
-
মুখ বা শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো
-
চুল পাতলা হয়ে যাওয়া বা চুল পড়ে যাওয়া
-
অতিরিক্ত ক্লান্তি ও অবসাদ
-
মুড সুইং, উদ্বেগ বা হতাশা
-
গর্ভধারণে জটিলতা
দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি ও চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা
চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এই সমস্যা অবহেলা করলে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলের সমস্যা, উচ্চ রক্তচাপ, স্লিপ অ্যাপনিয়া এবং হৃদরোগের ঝুঁকি। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এর গভীর প্রভাব পড়ে, যার ফলে অনেক নারী উদ্বেগ ও ডিপ্রেশনের শিকার হন।
প্রত্যাশিত পরিবর্তন
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নতুন এই নাম চালু হলে নারীদের মধ্য থেকে অযথা ভয় ও ভুল ধারণা দূর হবে এবং রোগটি সম্পর্কে বাস্তবসম্মত ধারণা তৈরি হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও আসবে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। শুধু সন্তানধারণ নয়, বরং পুরো শরীরের হরমোন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের সঙ্গে এই সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে—এই বার্তাই এখন চিকিৎসকরা জোরালোভাবে সামনে আনতে চাইছেন।